পাশে থাকতে শেখা - নিজের এবং অন্যের

 

কান পেতে রই সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি ২০১৪ সালে, জাফর ইকবাল স্যারের বই "টুনটুনি ও ছোটাচ্চু" থেকে।  বইটির উৎসর্গপত্রে কান পেতে রইয়ের নাম ছিলো। উৎসর্গপত্রের নোটটুকু আমার অত্যন্ত প্রিয় তাই পুরোটাই তুলে দিলাম - 

"তোমরা কিছু তরুন তরুনী মিলে নিঃসঙ্গ, বিপর্যস্ত,  হতাশাগ্রস্তদের মানসিক সেবা দেবার জন্যে একটি হেল্পলাইন খুলেছ।এমনকি আত্মহত্যা করতে উদ্যত কেউ কেউ শেষমুহূর্তে তোমাদের ফোন করেছিলো বলে তোমরা তাদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছো। আমি আমার সুদীর্ঘ জীবনে কখনো কারোর জীবন বাঁচাতে পারিনি কিন্তু তোমরা এই বয়সেই মানুষের জীবন বাঁচাতে পার - কী আশ্চর্য! "

নিজের অজান্তেই আমিও হয়তো কয়েকবার বলে ফেলি, কী আশ্চর্য, কী আশ্চর্য। না জানি ওনারা কত মানুষের কষ্টের সময় পাশে থেকেছেন, কত কত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। অজানা অদেখা এই সেচ্ছাসেবী মানুষগুলোর প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে আমার মধ্যে। মনের কোনে একটা সুপ্ত ইচ্ছেও ঘোরাঘুরি করতে থাকে, "ইশ! আমিও যদি ওদের একজন হতে পারতাম।" তখনও বুঝিনি লরা ইঙ্গলসের মতো বলা মাত্রই  ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেছে আমার।

আত্মহত্যা শব্দটার সঠিক অর্থ প্রথম বুঝতে পারি স্কুলের এক সহপাঠীর আত্মহত্যার সংবাদে। প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম সেদিন। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, সৎবাবা, নানার বাড়িতে ওকে ফেলে যাওয়া এতো অবহেলা ওই ছোট্ট মেয়েটি আর সহ্য করতে পারেনি। প্রচন্ড অভিমানে বেশ কষ্ট দিয়ে শেষ করে দিয়েছিলো নিজেকে।

আর আমার মনে রেখে গিয়েছিলো হাজারো প্রশ্ন। ঘুরেফিরে নিজেকেই প্রশ্ন করতাম, এমন ভয়ংকর একটা কাজ চুপচাপ কাউকে না জানিয়ে কিভাবে করলো ও! 

বহু বছর পর উত্তরটা পেয়েছি, মোটেই চুপচাপ কাউকে না জানিয়ে আত্মহত্যা মতো একটা পদক্ষেপ নেয়নি ও। কেউই নেয় না।  প্রত্যেক আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তিই চিৎকার করে বলে তারা বাঁচতে চায়। আফসোস আমরা বেশিরভাগই  তাদের চিৎকারটা শুনতে পাই না। বা শোনার কোনো চেষ্টাই করি না। কান পেতে রইয়ের সেচ্ছাসেবীরা এই কাজটি করে। তারা কান পেতে থাকে এমন সময় গুলোতে মানুষের পাশে থাকার জন্য।

কান পেতে রইয়ের ট্রেনিংয়ের পর প্রথম নিজের চারিত্রিক কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি। উপলদ্ধি করি নিজের অজান্তেই  আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আত্মহত্যা প্রবণ একটা মানুষকে সাহায্য করার পরিবর্তে আরো ক্ষতি করে ফেলি । এই উপলদ্ধিটা আমাকে পরবর্তীতে অনেক পরিস্থিতি মোকাবেলায়  সাহায্য করছে। কান পেতে রইয়ের ট্রেনিং, রোলপ্লে, কাজের অভিজ্ঞতা ব্যাক্তি জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। তার অন্যতম হচ্ছে  ভিন্নমত পোষণ করেও  ননজাজমেন্টাল থেকে সহমর্মিতার সাথে মানুষের পাশে থাকা যায়।

Photo courtesy: google

কান পেতে রইতে কাজ করতে করতে আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বহু প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। নাম না জানা কারোর কষ্ট অনুভব করেছি, আবার কখনো কোনো কলার পরবর্তীতে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছে শুনে আনন্দে আটখানা হয়েছি। তবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, এখানে অচেনা অজানা মানুষগুলোর পাশে থাকতে থাকতে , আমি নিজে নিজের পাশে  থাকতে শিখেছি। 

জে কে রাওলিংয়ের মতে হ্যারি পটারের ডিমেন্টরস হচ্ছে ডিপ্রেশনের প্রতীক। আর এই ডিমেন্টরদের তাড়ানোর ডিফেন্স  স্পেল হচ্ছে Petronus Charm (one of your happiest and powerful memory). আমার পেট্রোনাস লিস্টের বেশ কিছু মেমোরি কান পেতে রই থেকে পাওয়া।

 Kaan Pete Roi is one of my most powerful Petronus Charm.

 ধন্যবাদ  কান পেতে রই পরিবার 💜


Author Information

Helpline Volunteer 

Comments

Popular posts from this blog

আমার প্রিয় ৫০টি বই - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

We will miss seeing you!

অন্যের দুঃখ - বেদনার সঙ্গী হতে শিখেছি